তুরস্কের ইউরোপীয় স্বপ্ন শেষ, ‘সুলতান’ কি প্রস্তুত ইউরেশিয়ার জন্য?-emtv - দৈনিক একুশে

এইমাত্র পাওয়া খবর

Home Top Ad

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Sunday, 1 July 2018

তুরস্কের ইউরোপীয় স্বপ্ন শেষ, ‘সুলতান’ কি প্রস্তুত ইউরেশিয়ার জন্য?-emtv


একুশে মিডিয়া টিভি:

'পশ্চিমা মূল্যবোধের' সমর্থকদের সম্পূর্ণ হতাশ করে দিয়ে ইউরোপের পূর্বাঞ্চলে এখন দু'টি জনপ্রিয় একনায়কতন্ত্র চলছে: পুতিনের রাশিয়া এবং এরদোয়ানের তুরস্ক। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রাজনৈতিক নেতারা ঢালাওভাবে হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো 'লিবারেল নয় এমন অনুদার গণতন্ত্রের' সমালোচনা করেই যাচ্ছেন। স্বেচ্ছাচারী শাসন, ভিনদেশিদের ভয় পাওয়া, ও বাকস্বাধীনতা দমন অনুদার গণতন্ত্রের অবস্থার অবনতি ঘটায়। একই কথা হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া, সার্বিয়া, স্লোভাকিয়া, এবং চেক রিপাবলিকের পেশিবহুল নেতাদের জন্যও প্রযোজ্য। এসব দেশের নেতাদের সাফল্যের বুদবুদে ভোটাদের ভাবনা এবং অনুভূতি প্রতিফলিত হচ্ছে না কেন তা ইউরোপীয় নেতারা ও তাদের সমর্থক রাজনৈতিক দল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মূলধারার মিডিয়া একদমই বুঝতে পারছে না । এর বদলে, 'মানুষকে সভ্য করার পাশ্চাত্য মিশন' দুর্বল হয়ে পড়া নিয়ে শোক প্রকাশ করে অপ্রাসঙ্গিক কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ইতিহাস ও বাইবেলের দোহাই দিয়ে একটি জগাখিচুড়ি দর্শন দাঁড় করাচ্ছেন। তারা ডার্থ ভেডারের মতো মহা খলনায়ক পুতিন থেকে শুরু করে এরদোয়ান, শি জিনপিং এবং খামেনিকে দেখে ভীতসন্ত্রস্ত। আর্নল্ড টয়েনবির ভবিষ্যদ্বাণী - 'ইতিহাস আবার যাত্রা শুরু করছে' এটারই নতুন রিমিক্সটা বুঝার চেষ্টা করার পরিবর্তে তারা বাকি দুনিয়ার সাথে পশ্চিমের বিরোধের বয়ানের চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছেন। ইউরেশিয়া (ইউরোপ ও এশিয়া একত্রে) পুনর্গঠনের শক্তিশালী প্রক্রিয়া বুঝার ক্ষমতা সম্ভবত তাদের নেই। এবং রজব তৈয়ব এরদোয়ান কেন তুরস্কে জনপ্রিয় তা না বুঝতে পারাও এই অক্ষমতারই অংশ। সুলতান ও সিইও সর্বশেষ নির্বাচনে জয়ী হয়ে এরদোয়ান এখন একজন সুলতান ও সিইও হিসেবে তুরস্ক শাসন করার জন্য প্রস্তুত। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সম্পর্কিত নতুন নিয়ম এরদোয়ানেরই মাথা থেকে এসেছে। এর আওতায় দেশটিতে প্রধানমন্ত্রীর কোনও পদ থাকছে না। ২০১৪ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে এরদোয়ান নিজেই তিন মেয়াদে (১২ বছর) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরদোয়ান হয়ত প্রশাসন ও বিচারবিভাগ শাসন করতে পারবেন, কিন্তু আইন প্রণয়নের জন্য এটা যথেষ্ট নয়। ৪২.৫% ভোট ও ২৯৫টি আসন পাওয়ায় এরদোয়ানের একেপি দল ১৬ বছরের মধ্যে প্রথমবার পার্লামেন্টে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। এখন তাদেরকে অবশ্যই চরম ডানপন্থী এমএইচপি দলের সাথে জোট গঠন করতে হবে। কেয়ামত খুব কাছে এমন ভয়ে ভীত লোকজনরা ইসলামের অসহিষ্ণু রাজনীতি ও চরম ডানপন্থী ফ্যাসিস্ট রাজনীতির মিশ্রণকে বিষাক্ত জোট হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। তবে, বাস্তবতা আরও সূক্ষ। এমআইচপি দল একেপির চেয়েও বেশি পাশ্চাত্যবিরোধী এটা মনে রেখেও সামনের পরিকল্পনা ভূ-রাজনৈতিকভাবে শুধু একটি দিকেই ধাবিত হতে পারে, এবং তা হল: ইউরেশিয়া এক করে ফেলা। যত যাই হোক, তুরস্ককে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অন্তর্ভুক্ত করার বিঘ্নিত প্রক্রিয়ায় অগ্রগতির কোনও সম্ভাবনা নেই; ইইউয়ের কাছে এরদোয়ান একজন অনাকাঙ্ক্ষিত, অনুদার ও ছদ্ম গণতন্ত্রবাদীর বেশি কিছুই নন। এর সমান্তরালে, এরদোয়ানের নিও-অটোমানিজম বা নব্য-উসমানী খিলাফত সিরিয়া সম্পর্কিত কৌশলের ব্যর্থতার পর বাস্তবতা কী তা টের পেয়েছে। তবে কুর্দিদের সম্পর্কে আচ্ছন্নতা এতে কাটবে না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ওয়াইপিজের বিরুদ্ধে 'ইউফ্রেটিস শিল্ড' ও 'অলিভ ব্রাঞ্চ' এই অভিযানগুলোর সফলতার পর এই সম্ভাবনা কম। ওয়াইপিজেকে তুরস্ক সন্ত্রাসী সংগঠন পিকেকের বর্ধিত অংশ হিসেবে অভিহিত করছে। আগে কুর্দিদের দখলে থাকা আফরিন এখন তুরস্কের দখলে। এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মধ্যকার একটি চুক্তির কারনে ওয়াইপিজেকে মানবিজ এলাকা ছেড়ে যেতে হবে। এমনকি 'আসাদকে ক্ষমতা ছাড়তেই হবে' এই ঘোষণা বাতিল করার পরও, তুরস্ক সব ধরনের বাস্তব কারনে সিরিয়ায় প্রভাব বজায় রাখতে চাইবে। একই সাথে তারা রাশিয়া ও ইরানের সাথে আস্তানা শান্তি প্রক্রিয়াতেও অংশ নিচ্ছে। সেতুর দিকে যাত্রা তুরস্কের রাজনীতিতে আগে ডানপন্থী ও বামপন্থীদের মধ্যে পালাবদল চলত, কিন্তু ধর্ম নিরপেক্ষ সামরিক বাহিনী সবসময়ই পুতুল নাচের অধিকর্তার ভূমিকায় থাকত। ডানপন্থী ধর্মীয় দলকে সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখা হতো, কারণ সামরিক বাহিনী আনাতোলিয়া অঞ্চলে এদের জনপ্রিয়তার কারনে থাকত ভীত। যখন ২০০২ সাল থেকে একেপির রাজনৈতিক বিজয় শুরু হয় তখন তারা ইউরোপপন্থি ছিল। একেপি কুর্দিদের সাথেও সুসম্পর্ক বজায় রাখে। কুর্দিরা তাদের সর্বময় গ্রামীণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রক্ষণশীল ছিল। একেপি ও এরদোয়ান গুলেনিস্টদের সাথেও জোট গঠন করেছিল। কিন্তু নির্বাচনী এলাকায় পাকাপোক্ত ভিত্তি তৈরির পর সব আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ২০১৩ সালে গাজি পার্ক আন্দোলন দমনটা সম্ভবত বাঁক বদল ছিল। এরপর, ২০১৫ সালে কুর্দি সমর্থক এবং বামপন্থী ডেমোক্রেটিক পিপলস পার্টি (এইচডিপি) এসে একেপির ভোট নিয়ে যেতে শুরু করে। এর প্রতিক্রিয়ায় এরদোয়ানের এইচডিপির সাথে 'সন্ত্রাসী' পিকেকে দলকে মিশিয়ে ফেলার একটি কৌশল গ্রহণ করেন। দলটির নেতাদের নিয়মিত জেলে ঢুকানো হয়। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে এইচডিপির নেতা সেলাহাত্তিন দেমিরতাস জেলে থেকেই প্রচারণা চালান। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, 'আজকাল আমরা যে অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি তা কেবল একনায়কতন্ত্রের সিনেমার বিজ্ঞাপন। আসল গল্প এখনও শুরুই হয়নি।' অসংখ্য বাধাবিপ্ততির মুখেও এইচডিপি উল্লেখযোগ্য ১১.৭% ভোট তথা ৬৭টি আসন পেয়েছে। 'ওয়ান ম্যান রুল বা একজনের শাসন' আসলে পুরো দুই বছর আগেই শক্ত ভিত্তির প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সামরিক বাহিনীর গুলেনিস্টদের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পরপরই আসলে এটা হয়েছিল। এরদোয়ান ও একেপির নেতারা এখন নিশ্চিন্ত যে গুলেনিস্টরা ন্যাটোর সহায়তা পেয়েছিল। এর পরে সামরিক বাহিনী থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিদের সরিয়ে ফেলার যে প্রক্রিয়া শুরু হয় তা ছিল প্রলয়ঙ্করী, যার শিকার হয় হাজার হাজার মানুষ । শিক্ষক থেকে শুরু করে সাংবাদিক যেই এরদোয়ান বা পূর্ব আনাতোলিয়ায় চলমান নোংরা যুদ্ধের সমালোচনা করেছে তাকেই চুপ করিয়ে দেয়া হয়েছে। এরদোয়ান কিভাবে 'ইরাক সিরিয়ার ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর' দোহাই দিয়ে আগাম নির্বাচনের অপরিহার্য বলে তুলে ধরেছেন তার ওপর জোর দেন তুরস্কের ইতিহাসবিদ কাম এরিমতান। এরদোয়ান বলেন 'অনিশ্চিত অবস্থা পার হয়ে যাওয়া তুরস্কের জন্য একান্ত জরুরী'। একেপি ও এমএইচপির 'পিপলস অ্যালায়েন্স'-কে এরিমতান একবিংশ শতাব্দীর 'তুর্কি-ইসলামি সমন্বয়' বলে অভিহিত করেন। তিনি মনে করেন, 'একেপির ভিত্তি বিস্তৃত এবং তারা সম্পূর্ণ একমত যে বর্তমান ব্যবস্থার রদবদলগুলো ঠিকই আছে এবং তুরস্কের জনজীবনে ইসলাম আবার ফিরিয়ে আনার সময় বেশ আগেই হয়েছে।' অতএব, অনুদার হোক আর যাই হোক, বাস্তবতা হচ্ছে তুর্কি ভোটাররা এরদোয়ানকে অন্যদের চেয়ে পছন্দ করে। ইউরোপের অংশ হওয়ার স্বপ্ন সম্ভবত চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। ন্যাটোর সাথে তাদের সম্পর্ক ভাল না। নব্য-উসমানী খিলাফতের একটা মাইন পুঁতে রাখা মাঠের মতো বিপদজনক। অতএব ইউরেশিয়া গঠনের পথটাই সবচেয়ে সুবুদ্ধির পরিচায়ক। ইরানের সাথে তাদের সম্পর্ক এখন স্থিতিশীল রয়েছে। রাশিয়ার সাথে জ্বালানি ও সামরিক সম্পর্ক এর চেয়ে ভাল আর কখনও ছিল না। তুরস্ক এখন মধ্য এশিয়া জুড়ে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করতে পারে। রাশিয়া ও চীন তাদেরকে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও)-তে যোগ করার জন্য প্রলুব্ধ করছে। এরদোয়ান হয়ত শেষমেশ তুরস্ককে নতুন সিল্ক রুট বা বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) ও পাশ্চাত্যের মধ্যে অপরিহার্য সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হবেন। যে ক্লাব আপনাকে সদস্য হিসেবে নিতে চায় না তাতে যোগ দেয়ার চেষ্টা করার বদলে এটা অনেক বেশি ভাল অবস্থা। 'অনুদার গণতন্ত্র'? তাতে কার কী আসে যায়? [এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত পেপে এস্কোবারের ' Turkey’s European dream may be over, is the Sultan ready for Eurasia?' প্রবন্ধের অনুবাদ।]


No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

Pages