![]() |
একুশে মিডিয়া টিভি:
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) বিবিএ’র ৩৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সৈয়দ মো.মাসুদ রানা (২৩)। অন্যান্য সাধারণ দিনের মতোই সকালে ঘুম থেকে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছিলেন। অসুবিধার কথা ভেবে যাওয়ার আগে সকালে মায়ের ঘুমও ভাঙাননি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে ঘাতক বাস কেড়ে নেয় তার জীবন। ঘুম থেকে উঠেই মা জানতে পারেন ছেলের মৃত্যুর সংবাদ। সোমবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে রাজধানীর মিরপুরের চিড়িয়াখানা সড়কের ঈদগাহ মাঠ মোড়ে বাস চাপায় নিহত হন মাসুদ রানা (২৩)। প্রতিদিনের মতো রিকশাযোগে বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়ার পথে দিশারী পরিবহনের একটি বাস মাসুদ রানাকে ধাক্কা দিলে তিনি রিকশা থেকে পড়ে যান।এরপর বাসটি না থামিয়ে তার গায়ের উপর দিয়ে চালিয়ে যায় চালক। এতে তার কোমরের নিচের অংশ থেঁতলে যায়। রিকশাচালকও গুরুতর আহত হন। সড়কেই কিছুক্ষণ পড়ে থাকেন মাসুদ রানা ও রিকশাচালক। পরে একটি ভাঙারির দোকানের তিন তরুণ এগিয়ে আসেন। তারা একটি সিএনজিতে তুলে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যায় দু’জনকে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মাসুদকে মৃত্যু ঘোষণা করেন বলে জানিয়েছেন বিইউবিটি’র ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) প্রফেসর মো. আবু সালেহ। আবু সালেহ বলেন, ‘মাসুদ বিবিএ’র ৩৫তম ব্যাচের শেষ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিল। সকাল সাড়ে ৯টায় তার ক্লাস ছিল। সে ক্লাস করার জন্য রিকশাযোগে বাসা থেকে আসছিল। ওই সময় দিশারী পরিবহনের একটি বাস তাকে বহনকারী রিকশাটিকে প্রথমে ধাক্কা দেয়। সে রিকশা থেকে পড়ে যায়। এরপর বাসটি তার উপর দিয়ে চালিয়ে যায়। বাস চালক ইচ্ছা করলে ধাক্কা লাগার পরই ব্রেক করতে পারতো। কিন্তু সে তা করেনি। সে জেনেশুনেই মাসুদের গায়ের ওপর দিয়ে বাসটি চালিয়ে যায়। এটা কোনোভাবেই দুর্ঘটনা না, এটা হত্যাকাণ্ড।’ ভিসি বলেন, ‘বাসটি চাপা দেয়ার পর ছেলেটি রাস্তায় পড়ে ছিল। কিন্তু কেউ তাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেনি। একটি ভাঙারি দোকানের তিন তরুণ এসে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তাদের তুলে নেয়। আমি খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পঙ্গু হাসপাতালে যাই। সেখানে গিয়ে দেখতে পাই মাসুদ আর বেঁচে নাই। তার পরিবারকেও খবর দেয়া হয়, তারাও হাসপাতালে আসেন।’ রাজধানীসহ সারাদেশে প্রায়ই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু কোনোটিরই বিচার হচ্ছে না বলে সড়কে এই হত্যাকাণ্ড থামানো যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন ভিসি মো. আবু সালেহ। তিনি বলেন, ‘একটি ঘটনার যদি বিচার হতো, তাহলে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতো না। এই পর্যন্ত আমরা একটি ঘটনারও বিচার হতে দেখিনি।’ নিহত মাসুদ রানার বাবার নাম সৈয়দ মো. জাহাঙ্গীর।মিরপুরের দক্ষিণ ভিসিলের ১১ নম্বর সড়কের ৬২ নম্বর বাড়ি তাদের। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে মাসুদ ছিলেন সবার বড়। কমার্স কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে বিইউবিটিতে ভর্তি হন তিনি। সোমবার বাসায় গিয়ে দেখা গেছে, তার মা বারবার ছেলের কথা স্মরণ করে বিলাপ করছেন। বাড়িতে প্রতিবেশীদের ভিড়। কারও কাছেই মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই। মাসুদ রানার ছোট বোন জান্নাতুল ফেরদৌস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে বের হয়ে যায় মাসুদ। ওই সময় বাসার সবাই যার যার কক্ষে ছিল। কাউকে বিরক্ত করতো না, নিজেই প্রস্তুত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যায়। এরপর সকাল পৌনে ১০টার দিকে আমার মামা আবুল কালাম আমাদের ফোন দিয়ে ঘটনা জানায়।’ তিনি বলেন, ‘মাসুদ রানার মোটরসাইকেল ছিল। এক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হওয়ায় মোটরসাইকেল বিক্রি করে দেয়। কিন্তু তারপরও আমার ভাই বাঁচতে পারলো না।’ জান্নাতুল বলেন, ‘রিকশা একটি নিরাপদ অযান্ত্রিক বাহন সেটিও বাসচালকরা নিরাপদ থাকতে দেয় না। তাদের বেপরোয়া গতিতেই আজকের এই হত্যা। আমরা এর বিচার চাই।’ ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা চিড়িয়াখানা সড়ক ও মিরপুর সনি সিনেমা হলের সামনে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত দুই হাজার শিক্ষার্থী সড়কে প্রতিবাদ করে। বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত তারা সড়কে ছিল। এরপর ভিসি সড়কে এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। রাতের মধ্যেই ঘাতক বাসচালককে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আহম্মেদ তাকে আশ্বস্ত করেন । এই আশ্বাস পাওয়ার পর মাসুদের সহপাঠীরা সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করে মঙ্গলবার সকাল ১০টা পর্যন্ত অবরোধ স্থগিত করে। নিহত মাসুদের ছোট ভাই সৈয়দ মো. রাব্বি বলেন, ‘মাসুদ রানা ঢাকা মহানর উত্তর ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তার বড় রাজনীতিবিদ হওয়ার স্বপ্ন ছিল। এলাকার সবাই তাকে ভালো জানতো।’ মাসুদের মৃত্যুর পর বিশ্ববিদ্যালয়টি সোমবার সব ধরনের ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা শোক প্রকাশ করেন। ডেপুটি রেজিস্ট্রার হাসান মঞ্জিল মোরশেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এই ঘটনায় শোকাহত, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।’ নিহত মাসুদের সহপাঠী আবু বক্কর সিদ্দিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাসগুলো সবসময় এই সড়কে প্রতিযোগিতা করে চলে। তারা মানুষকে মানুষ মনে করে না। এটা সড়ক দুর্ঘটনা না, হত্যাকাণ্ড, আমরা এর বিচার চাই। শিক্ষার্থীরা নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং বাসচালকের শাস্তি দাবি করেছে।শাস্তি না হলে আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব।’ বিশ্ববিদ্যালয়টি রূপনগর থানা এলাকায় হলেও ঘটনাস্থল শাহ আলী থানার মধ্যে। তাই এই ঘটনায় শাহ আলী থানায় একটি দুর্ঘটনাজনিত মামলা হয়েছে। শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাসটি আটক করা হয়েছে। চালক কে ছিল, তার মালিকপক্ষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে আটকের চেষ্টা চলছে। নিহতের লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’ সোমবার বিকালে আসরের নামাজের পর দক্ষিণ ভিসিলের মসজিদে জানাজা শেষে স্থানীয় একটি কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়েছে। সারাদিনই বিইউবিটি ও চিড়িয়াখানা সড়কে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা ছিল। রূপনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মো. শাহ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। আইন অনুযায়ী যা যা করার দরকার পুলিশ তা করবে।


No comments:
Post a Comment